ভূমিকা ও সারসংক্ষেপ
গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করে এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার শপথ নেয়। আজ ১৭ আগস্ট বর্তমান সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে অন্তত ৭জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে বলে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়। নিচে এর তালিকা দেয়া হলো:

পদ্ধতি
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র প্রতি মাসে মানবাধিকার বিষয়ক পরিসংখ্যান প্রকাশ করে থাকে। এরমধ্যে Extra Judicial Killings and Custodial Death ক্যাটাগরিতে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের পর থেকে জুলাই পর্যন্ত ৮টি মৃত্যুকে “বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড” হিসেবে নথিভুক্ত করেছে। আসকের পরিসংখ্যানের সূত্র ধরে গণমাধ্যম থেকে ঘটনাগুলোর ব্যাপারে তথ্য নিয়ে এই প্রতিবেদন তৈরী করেছে ক্রাইসিস ডকুমেন্টেশন সেন্টার-ক্রিডো। এক্ষেত্রে ক্রিডো কোনো সরেজমিনে তদন্ত করেনি, বরং তথ্যসূত্রে হিসেবে উল্লিখিত গণমাধ্যমগুলো থেকে তথ্য নিয়েছে। মৃত্যুর ঘটনাগুলোকেও আসক “বিচারবহির্ভূত হত্যা” হিসেবে নথিভুক্ত করেছে, ক্রিডো কোনো বিশ্লেষণে যায়নি, কেবল গণমাধ্যমের বরাতে ঘটনাগুলোর বর্ণনা সংক্ষেপে তুলে ধরেছে।
এখানে উল্লেখ্য, আসক যে ৮টি মৃত্যুর কথা উল্লেখ করেছে, এরমধ্যে একটি মৃত্যুকে আত্মহত্যা ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। আসকও এটিকে “Suicide (in custody)” ক্যাটাগরিতে রেখেছে। মৃত্য ব্যক্তির কোনো আত্মীয় বা কেউ নির্যাতনের অভিযোগ এনেছে বলে গণমাধ্যমে পাওয়া যায়নি, ফলে ওই মৃত্যুর ঘটনাটি আসকের পরিসংখ্যানে থাকলেও ক্রিডো এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করেনি। ক্রিডোর প্রতিবেদনে সবগুলো মৃত্যুর ঘটনাতেই গুলি বা নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে।
১. হ্লামংনু মার্মা
তারিখ: ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬। স্থান: বান্দরবান
অভিযুক্ত: বাংলাদেশ সেনাবাহিনী
গত ২৩ ফেব্রুয়ারি বান্দরবানের রোয়াংছড়িতে সেনাবাহিনীর সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস-মূল) গোলাগুলির ঘটনায় হ্লামংনু মার্মা নামের এক ব্যক্তি নিহত হন। বিকেল ৫টার দিকে উপজেলার তারাছা ইউনিয়নের মুরুং বাজার এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। মানবাধিকার সংস্থা মাসিক পরিসংখ্যানে এ ঘটনাটিকে
উক্ত ঘটনায় আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) একটি বিবৃতি দিয়েছে। তা হুবহু তুলে ধরা হলো:
“বান্দরবানে জেএসএস (মূল) সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর সফল অভিযান
ঢাকা, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ (সোমবার): আজ আনুমানিক বিকেল ৫ টায় সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলার মুরং বাজার এলাকায় ‘জেএসএস (মূল)’ এর সশস্ত্র দলের বিরুদ্ধে একটি সফল অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযান চলাকালে সেনা সদস্যরা সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের দলটিকে অবৈধ ভাবে চাঁদা আদায় কালে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। পরিস্থিতি বিবেচনায় জেএসএস (মূল) সদস্যরা পালানোর চেষ্টাকালে সেনাবাহিনীর টহল দলের উপর গুলিবর্ষণ করে। সেনাবাহিনীর টহল দল পাল্টা গুলিবর্ষণ করে তাদের ধাওয়া করে। প্রাথমিকভাবে তারা একটি স্কুল ঘরে আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করে এবং এক পর্যায়ে উক্ত স্থান থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এই অভিযানে সেনা টহল দল ঘটনাস্থল তল্লাশি চালিয়ে ইউনিফর্ম পরিহিত হ্লামংনু মার্মা নামক একজন সশস্ত্র জেএসএস (মূল) সদস্যকে অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করে। তার চিকিৎসার জন্য পুলিশের সহায়তায় জরুরী ভিত্তিতে তাকে বান্দরবান সদর হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। অভিযান শেষে ঘটনাস্থল থেকে ১টি সাবমেশিনগান (SMG), ১৪৩ রাউন্ড এসএমজি অ্যামোনিশন, ১৪ রাউন্ড পিস্তলের অ্যামোনিশন, ৫ রাউন্ড ব্লাঙ্ক অ্যামোনিশন, ২টি অস্ত্রের ম্যাগাজিন এবং অন্যান্য সরঞ্জামাদি উদ্ধার করা হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রামে সকল জাতিগোষ্ঠীর জানমালের নিরাপত্তা রক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বদ্ধপরিকর এবং ভবিষ্যতেও সশস্ত্র দলগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান অব্যাহত থাকবে।”
ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে বলা হয়, “রোয়াংছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এম সাকের আহমেদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, সেনাবাহিনীর সঙ্গে জেএসএসের গোলাগুলির ঘটনায় একজন আহত হয়েছিলেন, যিনি পরে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান।”
নিহত ব্যক্তিকে “দুর্বৃত্ত”রা হত্যা করেছে বলে সংবাদ প্রকাশ করে যুগান্তর। এতে বলা হয়, “আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয়রা জানায়, উপজেলার সদর ইউনিয়নের নোয়াপাড়ায় ঘরের বাইরে বসে থাকা অবস্থায় দুর্বৃত্তরা গুলি করে তাকে হত্যা করেছে। তিনি স্থানীয় বাসিন্দা নিসামং মারমার ছেলে। খবর পেয়ে পুলিশ ও সেনাসদস্যরা লাশ উদ্ধারে ঘটনাস্থলে গেছেন। নিহত যুবক পাহাড়ে কবিরাজের কাজ করতেন।”
২. আব্দুল হামিদ ওরফে ধলা (৬৪)
তারিখ: ৪ মার্চ, ২০২৬। স্থান: নওগাঁ (মহাদেবপুর)
অভিযুক্ত: পুলিশ
মার্চ মাসে গ্রেপ্তারের আগেই পুলিশের নির্যাতনে একজনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। নওগাঁর মহাদেবপুরে আব্দুল হামিদ ওরফে ধলা (৬৪) নামের এক বৃদ্ধ আসামী না হওয়া সত্ত্বেও হাতকড়া পরিয়ে পুলিশের টানাহেঁচড়া ও লাথি মারার পর ওই বৃদ্ধ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান বলে অভিযোগ ওঠে। পুলিশ ক্ষিপ্ত হয়ে লাথি মারার পর অসুস্থ হয়ে পড়েন বৃদ্ধ আব্দুল হামিদ। এরপরই তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক হলে পুলিশ তাকে ছেড়ে দিয়ে চলে যায়। স্থানীয়রা এসে আব্দুল হামিদকে মৃত অবস্থায় দেখতে পান।
৩. আকুব্বর মোল্লা (৩৭)
তারিখ: ১২ এপ্রিল, ২০২৬। স্থান: মাগুরা (মহম্মদপুর)
অভিযুক্ত: মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর
১২ এপ্রিল মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একটি অভিযানের সময় আকুব্বর মোল্লা (৩৭) নামে মাদক মামলার এক আসামির মৃত্যু হয়েছে। আকুব্বর মোল্লার স্ত্রী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সে (আকুব্বর) বারবার বলেছিল, ‘আপনারা আমারে মেরেন না, আমার কাছে কিছু নাই।’ আমি নিজেও অনেক অনুরোধ করেছি, কিন্তু তারা শোনেনি। ঘরে কিছু না পেয়ে তারা প্লাস্টিকের পাইপ, লাঠি দিয়ে আমার স্বামীকে বাড়য়ে (আঘাত) মেরে ফেলে দিয়ে গেছে। আমি এই হত্যার বিচার চাই।’ তবে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেছে অধিদপ্তর। তাদের দাবি, আসামি অসুস্থ বোধ করায় তাকে ফেলেই অধিদপ্তর স্থান ত্যাগ করে।
৪. আমিনুর রহমান গাজী (৪৫)
তারিখ: ১৮ মে, ২০২৬। স্থান: সাতক্ষীরা (সুন্দরবন)
অভিযুক্ত: বনরক্ষী (বন বিভাগ)
সাতক্ষীরার সুন্দরবনে গুলিতে আমিনুর রহমান গাজী (৪৫) নামে এক জেলে নিহত হন। নিহত ব্যক্তির সঙ্গে থাকা জেলেদের দাবি, বন বিভাগের স্মার্ট প্যাট্রল টিমের সদস্যদের ছোড়া গুলিতে তিনি নিহত হয়েছেন। ঢাকা স্ট্রিমের সংবাদে জানা যায়, বনবিভাগ দাবি করেছে, ধস্তাধস্তির সময় রাইফেল থেকে গুলি বেরিয়ে আমিনুর নিহত হন।
ডেইলি স্টার প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়, নিহতের সঙ্গে থাকা জেলে রমজান আলী গাজী জানান, ‘বৈধ পাস নিয়ে ৪ দিন আগে আমিনুর রহমান, আহম্মদ ও সেলিমের সঙ্গে আমি সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরতে যাই। আজ (১৮ মে) সকালে শতমুখি খালে কাঁকড়া ধরার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় বন বিভাগের খুলনা স্মার্ট পেট্রোল টিমের সদস্যরা আমাদের ডাক দেন। যেতে কিছুটা দেরি হলে টিমের সদস্যরা আমাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। এতে আমিনুর গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান।’
রমজান আলী আরও বলেন, ‘ঘটনার পর স্মার্ট পেট্রোল টিম দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। পরে আমরা মরদেহ নিয়ে গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে যাই।’
এ ঘটনার প্রতিবাদে সেদিন বিকেল সাড়ে চারটার দিকে কয়েক শ জেলে লাঠিসোঁটা নিয়ে বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন অফিস ও পরে সাতক্ষীরা রেঞ্জ অফিসে হামলা চালান। চেয়ার-টেবিলসহ বিভিন্ন আসবাব ভাঙচুর করা হয়। ৩০ থেকে ৪০ মিনিট হামলার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
এ ঘটনায় বন বিভাগের দুই কর্মকর্তাসহ অজ্ঞাতনামা ৯ থেকে ১০ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেছে নিহত জেলের পরিবার। অন্যদিকে বনরক্ষীদের ওপর হামলার অভিযোগে বন বিভাগের পক্ষ থেকেও একটি মামলা করা হয়েছে। তবে আসামিদের নাম প্রকাশ করা হয়নি বলে জানায় প্রথম আলো।
৫. মির্জা ইশতিয়াক আহমেদ ওরফে প্রান্ত (২৭)
তারিখ: ২১ জুন, ২০২৬। স্থান: ফরিদপুর (মধুখালী)
অভিযুক্ত: ডিবি পুলিশ
ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলায় পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সদস্যদের পিটুনিতে অসুস্থ হয়ে ছাত্রলীগ কর্মী মির্জা ইশতিয়াক আহমেদ ওরফে প্রান্তর মৃত্যু হয়েছে বলে তাঁর পরিবারের অভিযোগ। ২১ জুন রোববার সকাল আটটার দিকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। আগেরদিন শনিবার ওই যুবককে আটক করে ডিবি। এ সময় তাঁকে তাঁর মায়ের সামনেই পেটানো হয় বলে স্বজনদের অভিযোগ।
তবে ডিবি পুলিশের দাবি, ওই যুবককে নির্যাতন করা হয়নি। তাঁর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি আজ ভোরে তাঁকে নাশতা করানো হয়েছে।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মির্জা ইশতিয়াকের মামা মো. সাখাওয়াৎ হোসেনের ভাষ্য, গতকাল বিকেল পাঁচটার দিকে তাঁর ভাগনে ইশতিয়াক বাড়ির সামনে ছিলেন। এ সময় একটি মাইক্রোবাসে করে ডিবি পুলিশের ১২-১৩ জন সদস্য এসে ইশতিয়াককে আটক করে মারধর করেন। ইশতিয়াকের মা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়। পরে ডিবি পুলিশের সদস্যরা বাড়ির মধ্যে ঢুকে প্রতিটি কক্ষের যাবতীয় জিনিসপত্র তছনছ করেন। এরপর তাঁর ভাগনেকে গাড়িতে তুলে অজ্ঞাত জায়গায় নিয়ে যান।
ইশতিয়াকের পরিবারের সদস্যদের দাবি, গতকাল সারা রাত পরিবারের সদস্যরা মধুখালী থানা, ডিবি পুলিশসহ বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করে ইশতিয়াকের কোনো হদিস পাননি। পরে আজ সকাল আটটার দিকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইশতিয়াকের মৃত্যু হয়েছে বলে জানতে পারেন।
ইশতিয়াককে মাদকসহ আটকের অভিযোগে মামলা হয়েছিল। ডিবির দায়ের করা মামলার এজাহারে বিভিন্ন অসঙ্গতি খুঁজে পেয়েছে প্রথম আলো। ‘ডিবির হেফাজতে’ ছাত্রলীগ কর্মীর মৃত্যুর আগে আটকের সময় কী ঘটেছিল, এমন ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছিল। এতে ইশতিয়াককে লুঙ্গি পরিহিত দেখা যায়। তবে এজহারে তাঁর ‘প্যান্টের পকেট থেকে গাঁজা’ উদ্ধারের দাবি করা হয়েছে। এজহার অনুযায়ী, তিনি তাঁর প্যান্টের ডান পকেট থেকে পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায় ১০০ গ্রাম গাঁজা নিজ হাতে বের করে দেন। যদিও আটক হওয়ার সময় ইশতিয়াকের পরনে ছিল লুঙ্গি।
এজহার অনুযায়ী, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ২০ জুন দিবাগত রাত ২টা ১০ মিনিটে ডিবি পুলিশের কয়েকজন সদস্য ঘটনাস্থলে যান। তাঁদের উপস্থিতি টের পেয়ে আসামি ইশতিয়াক পালানোর চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে ডিবির সদস্যদের হাতে ধরা পড়েন। কিন্তু ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, ঘটনাটি ছিল দিনের বেলায়।
ভিডিওতে আরও দেখা যায়, পুলিশ সদস্যরা ইশতিয়াককে থাপ্পড় দিচ্ছেন এবং তাঁর দেহ তল্লাশি করছেন। পরে ইশতিয়াকের অবস্থান থেকে কিছুটা দূরে পড়ে থাকা একটি বস্তু দেখে ডিবি সদস্যদের বলতে শোনা যায়, ‘এই যে এক পোঁটলা’।
ইশতিয়াকের বিরুদ্ধে মামলার দুই সাক্ষীর সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলো প্রতিবেদকের। তাঁদের বক্তব্যের সঙ্গে ডিবি পুলিশের মামলার বিবরণের কোনো সংগতি পাওয়া যায়নি। সাক্ষী মো. আলমগীর হোসেন বলেন, ঘটনাস্থল হিসেবে যে স্থানের কথা উল্লেখ করেছে, তিনি সেখানে ছিলেন না। তিনি জানতেন না তাকে মাদক মামলার সাক্ষী করা হয়েছে।
অপর সাক্ষী বিনয় কুমার সাহার ছেলে দাবি করে, তাঁর বাবা না চাওয়া সত্ত্বেও জোর করে সাক্ষী বানানো হয়েছে।
ছাত্রলোগ কর্মী মৃত্যুর ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ২৩ জুন ডিবি ফরিদপুর সদর জোনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সৈয়দ মো. আলমগীর হোসেনকে প্রত্যাহার করা হয়। ফরিদপুরের পুলিশ সুপার নজরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
এই ঘটনাটিকে গ্রেপ্তারের পর নির্যাতনে মৃত্যু হিসেবে নথিভুক্ত করেছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র।
৬. শওকত সরদার (৫৫)
তারিখ: ২৫ জুন, ২০২৬। স্থান: খুলনা (কয়রা)
অভিযুক্ত: কোস্ট গার্ড
সুন্দরবনের কথিত বনদস্যু ‘দুলাভাই বাহিনী’র বিরুদ্ধে কোস্টগার্ডের অভিযানে একজন নিহত হন। প্রথম আলোর সংবাদমতে, কোস্টগার্ড ও পুলিশ সূত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে কয়রা উপজেলার তেঁতুলতলার চরসংলগ্ন আড়ুয়াশিবসা নদীর পাশে সুন্দরবনের বেশোখাল এলাকায় বিশেষ অভিযান চালানো হয়। কোস্টগার্ডের ভাষ্য অনুযায়ী, সদস্যদের উপস্থিতি টের পেয়ে বনদস্যুরা অতর্কিত গুলি চালালে আত্মরক্ষার্থে কোস্টগার্ডও পাল্টা গুলি চালায়। গোলাগুলি চলে গতকাল শুক্রবার ভোর পর্যন্ত। ওই অভিযানে একজন নিহত হয়েছেন। পরে ঘটনাস্থল থেকে ৬টি একনলা বন্দুক, ৬৯টি তাজা কার্তুজসহ বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করা হয়েছে।
কোস্টগার্ডের দাবি, গোলাগুলির পর ঘটনাস্থল থেকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় রবিউল ইসলামসহ তিনজনকে উদ্ধার করা হয়।
কোস্টগার্ড আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়ার আগে, সুন্দরবনে রাতভর গুলির শব্দে আতঙ্কে ঘর ছেড়ে বনপাড়ের মানুষ রাস্তায় আসেন বলে একটি প্রতিবেদন করেছে প্রথম আলো। এতে উল্লেখ করা হয়, স্থানীয় বাসিন্দা ইয়াসিন আরাফাত বলেছেন, ‘শতাধিক গুলির শব্দ শুনিছি। রাইতের অন্ধকারে গুলির শব্দের পাশাপাশি আগুনের শিখাও দেখা যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল ঘটনাটি লোকালয় থেকে খুব বেশি দূরে না। আমি মোবাইলে গুলির শব্দের ভিডিও ধারণ করিছি। রাতে মনে হয়েছিল দুই দস্যু বাহিনীর মধ্যে গোলাগুলি হচ্ছে। সকালে জানতে পারি, কোস্টগার্ডের সঙ্গে দুলাভাই বাহিনীর গোলাগুলি হইছে।’
এতে আরও বলা হয়, “স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, অভিযানের সময় কোস্টগার্ড দুলাভাই বাহিনীকে ঘিরে ফেলে এবং আত্মসমর্পণের আহ্বান জানায়। তখন দস্যুরা গুলি চালালে কোস্টগার্ডও পাল্টা গুলি চালায়। তাঁদের দাবি, এতে দস্যু দলের একজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। দস্যুদের একটি ট্রলারও কোস্টগার্ডের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে এসব তথ্যের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।”
পরবর্তীতে ২৭ জুন তারিখে কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন আনুষ্ঠানিকভাবে একজনের নিহত ও বাহিনীর প্রধানসহ দুজনকে আটকের খবর জানানো হয়।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র ঘটনাটিকে মাসিক পরিসংখ্যানে “আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্বারা বিচারবহির্ভূত হত্যা” হিসেবে “গ্রেপ্তারের আগে গুলি করে হত্যা” ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভূক্ত করেছে।
৭. মিজানুর রহমান (৫৫)
তারিখ: ৩০ জুলাই, ২০২৬। স্থান: চাঁদপুর (ফরিদগঞ্জ)
অভিযুক্ত: পুলিশ
চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে সাত বছরের এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে কড়ইতলী পাটওয়ারী বাড়ির বাইতুল হামদ জামে মসজিদের পেশ ইমাম মিজানুর রহমান (৫৫)-কে ২৬ জুলাইয়ের অভিযোগের ভিত্তিতে ৩০ জুলাই ভোরে নিজ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য, গ্রেপ্তারের পর থানায় নেওয়ার পথে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদন অনুয়ায়ী, পুলিশ জানায়, গত ২৬ জুলাই কড়ইতলী গ্রামে সাত বছরের এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ ওঠে মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় শিশুটির বাবা মো. নূরুল ইসলাম খান বৃহস্পতিবার ভোরে ফরিদগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশের একটি দল অভিযান চালিয়ে তাকে নিজ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. মাকছুদুল হাছান বলেন, ভোর ৫টা ৫৫ মিনিটে পুলিশ তাকে সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসে। তাৎক্ষণিক অক্সিজেনসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হলেও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে শরীরে কোনো দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।
তবে নিহতের পরিবার পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। নিহতের শ্যালক ও স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য আলী হায়দার উজ্জ্বল দাবি করেন, একটি মিথ্যা অভিযোগকে কেন্দ্র করে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে মিজানুর রহমানের কাছে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করছিলেন। চাঁদা না পেয়ে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তাকে গ্রেপ্তার করানো হয়েছে। গ্রেপ্তারের সময় তাকে ফজরের নামাজ আদায়ের সুযোগও দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। একই সঙ্গে তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল বলেও দাবি করে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানান।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র তাদের পরিসংখ্যানে ঘটনাটিকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে নথিভুক্ত করেছে এবং Death by Physical Torture (after arrest) ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভূক্ত করেছে।
