বাংলাদেশে সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকা মোংলার জেলে মিরাজ শেখের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাকে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর গত দুই বছরের মধ্যে গুমের প্রথম ঘটনা বলে ধারণা করছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। এই ঘটনায় দেওয়া “Bangladesh: First Enforced Disappearance Case Since July 2024 Uprising” শীর্ষক প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাটি বলেছে, জোরপূর্বক গুমের শিকার হওয়ার আগে মি. শেখকে সর্বশেষ কোস্ট গার্ডের হেফাজতে দেখা গিয়েছিল।
মিরাজ আদৌ নিখোঁজ হয়েছেন কি না বা কোথায় গেছেন, সে বিষয়ে জানা নেই দাবি করে কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের মিডিয়া কর্মকর্তা লে. কমান্ডার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘এখানে আরেকটা বিষয় লক্ষণীয়, গত ২১ তারিখে আমরা সামাদ নামের এক ডাকাতকে ধরছিলাম। সুন্দরবনের ছোট সুমন বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড সামাদ জিজ্ঞাসাবাদে তাদের দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পাঁচজনের নাম বলে। ওই পাঁচজনের মধ্যে মিরাজের নামও ছিল। পরবর্তীতে গত ২২ এপ্রিল যৌথ বাহিনীর একটা অভিযান হয়। এ সময় আমরা ওই পাঁচজনের মধ্যে দুজনকে আটক করি। তখন মিরাজকেও খোঁজা হয়। কিন্তু সেদিন তাঁকে পাওয়া যায়নি। আর ২২ তারিখের ওই অভিযানের পর ২৩ তারিখ তাঁর পরিবার থানায় মিরাজ নিখোঁজ উল্লেখ করে জিডি করে।’ তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘১০ তারিখে যদি নিখোঁজ হয়, ১২-১৩ দিন পর জিডি হবে? বিষয়গুলো খুবই সাসপেশিয়াস।’
তবে জিডির প্রসঙ্গে মিরাজের বোন লিজা ইসলাম দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “আমরা ৪ বার থানায় যাই আমাদের জিডি নেয়না। পরবর্তীতে ২৩ এপ্রিল আমাদের জিডি নেওয়া হয়। পুলিশ তখন আমাদের বলে দেখেন আমরা কী করবো, ওদের অনেক পাওয়ার।”
মিরাজ শেখকে আদালতে হাজির করার জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষকে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মিরাজ নিখোঁজ রয়েছেন।
এখানে মিরাজ শেখ নিখোঁজ সংক্রান্ত যাবতীয় ঘটনাপ্রবাহ তারিখ অনুযায়ী উল্লেখ করা হলো। উল্লেখ্য, এই ঘটনাপ্রবাহ তথ্যসূত্রে উল্লিখিত গণমাধ্যম ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদন অনযুয়ায়ী লেখা। ক্রিডো কোনো সরেজমিন তদন্ত করেনি। ঘটনাটিকে “সম্ভাব্য জোরপূর্বক গুম” হিসেবেও অভিহিত করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, ক্রিডো কোনো বিশ্লেষণ হাজির করেনি। ভবিষ্যতে এই ঘটনা সংশ্লিষ্ট খবর প্রকাশিত হলে প্রতিবেদনটি আপডেট হতে থাকবে।
১০ এপ্রিল, ২০২৬ (সন্ধ্যা ~৭টা) — বাগেরহাটের মোংলার জয়মনির ঘোল এলাকার মৎস্যজীবী মিরাজ শেখ (৩০) আল আমিনের চায়ের দোকানে চা খাওয়ার সময় কোস্টগার্ডের হারবাড়িয়া স্টেশন থেকে আসা নৌকায় দুজন সাদাপোশাকধারী ব্যক্তি তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করে জোর করে ধরে নিয়ে যান। একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায়, মারধরের পর তাঁকে জেটিতে নিয়ে একটি নৌকায় তোলা হয়, কালো কাপড়/কম্বল দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়, পরে কোস্টগার্ডের স্পিডবোটে হাতকড়া পরিয়ে মোংলার দিকে নেওয়া হয়। স্ত্রী মুক্তা খাতুন ঘটনাস্থলে পৌঁছে এই দৃশ্য দেখেন।
সূত্র: প্রথম আলো, ১৬ মে ২০২৬; দ্য ডিসেন্ট, ৩০ জুলাই ২০২৬
১১ এপ্রিল — পরিবার মোংলার দিগরাজ কোস্টগার্ড কার্যালয়ে যায়। প্রথমে অস্বীকার করা হয়। স্ত্রী মুক্তা খাতুনের ভাষ্য, “পরে আমি পা ধরে কান্নাকাটি করার পর উপাশীন বা উশাশীন নামে একজন যিনি বেইজের গেইটে ছিলেন তিনি তখন কাউকে ফোন দেন। মোবাইলে কথা শেষে তিনি আমাকে বলেন, আপনার স্বামীকে নিয়ে অপারেশনে যাওয়া হয়েছে। আপনি বিকালে আসেন, তখন দেখতে পারবেন। আমি ঐ সময় গেইটে দাঁড়িয়েছিলাম। আমি তখন তাদের বলতে শুনেছি, তারা বলাবলি করছিলো, মিরাজকে খাবার খেতে দাও, ওরে নিয়ে অপারেশনে যাওয়া হবে।”
সেদিন বিকেলে পরিবার আবার গেলে মিরাজকে ধরে নেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করা হয়।
সূত্র: HRW, ২০ জুলাই ২০২৬; দ্য ডিসেন্ট, ৩০ জুলাই ২০২৬
২১–২২ এপ্রিল — মিরাজের মোটরসাইকেল যে দোকানে রাখা ছিল, সেখান থেকে কোস্টগার্ড পরিচয়ে একজন এসে এটি নিয়ে যান; পরদিন ফেরত দেওয়া হয়।
সূত্র: প্রথম আলো, ১৬ মে ২০২৬
২৩ এপ্রিল — চার দফা থানায় যাওয়ার পর অবশেষে জিডি নেওয়া হয়। পরিবারের অভিযোগ, পুলিশ কোস্টগার্ডের নাম বাদ দিয়ে জিডিতে লিখে দেয় যে মিরাজ “নিজ বসতবাড়ির নিচে নিজের অজান্তে হারিয়ে গেছেন”, মূল অভিযোগের সঙ্গে যার কোনো মিল নেই। মোংলা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার অবশ্য দ্য ডিসেন্টকে বলেন, জিডিতে “অপহরণ” বা “গুম” শব্দ লেখা যায় না বলেই ভাষা এমন হয়েছে, জোর করে লেখানো হয়নি। সূত্র: দ্য ডিসেন্ট, ৩০ জুলাই ২০২৬
৮ মে — মিরাজ শেখের সন্ধান চেয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে মোংলা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করা হয়। সূত্র: প্রথম আলো, ১৬ মে ২০২৬
১৪ মে — স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, কোস্টগার্ডের মহাপরিচালক, পুলিশ মহাপরিদর্শক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি পাঠান মুক্তা খাতুন। সূত্র: প্রথম আলো, ১৬ মে ২০২৬
১৬–১৭ মে — আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) সরেজমিন তথ্যানুসন্ধান চালায়; পরিবার, প্রত্যক্ষদর্শী, পুলিশ ও কোস্টগার্ড কর্মকর্তাদের বক্তব্য নেয়, এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানায়। সূত্র: দ্য ডিসেন্ট, ৩০ জুলাই ২০২৬
৯ জুন — মিরাজের সন্ধান দাবিতে পরিবার ও গ্রামবাসীর মানববন্ধন। অভিযোগ, কোস্টগার্ড মিরাজের স্ত্রী ও বোনকে মারধর করে। সূত্র: দ্য ডিসেন্ট, ৩০ জুলাই ২০২৬
১১ জুন — উত্তেজনার জেরে স্থানীয়দের একাংশ কোস্টগার্ডের হারবাড়িয়া স্টেশনে ঢুকে ভাঙচুর চালায়; পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কোস্টগার্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে। কোস্টগার্ডের দাবি, হামলার পেছনে বনদস্যু ও তাদের সহযোগীদের হাত ছিল। সূত্র: প্রথম আলো, ১১ জুন ২০২৬
১২ জুন — এই হামলার ঘটনায় কোস্টগার্ডের করা মামলায় ৪৪ জনের নামসহ প্রায় ৩০০ জনকে আসামি করা হয় — যার মধ্যে ১, ২ ও ৩ নম্বর আসামি যথাক্রমে মিরাজের স্ত্রী মুক্তা খাতুন, বোন লিজা ইসলাম ও মা তাসলিমা বেগম। মামলায় প্রায় ২ কোটি ২৫ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতির দাবি করা হয়। এই তিনজনসহ মোট ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সূত্র: প্রথম আলো, ১২ জুন ২০২৬
১২ জুন – ৯ জুলাই — মিরাজের মা, স্ত্রী ও বোন ২৭ দিন কারাবন্দি থাকার পর জামিনে মুক্তি পান। সূত্র: দ্য ডিসেন্ট, ৩০ জুলাই ২০২৬
২২ জুন — মিরাজকে বেআইনিভাবে আটক রাখা হয়নি, তা নিশ্চিত করতে তাঁকে আদালতে হাজির করার নির্দেশনা চেয়ে তাঁর বাবা মো. মোস্তফা শেখ আবেদনকারী হয়ে রিট করেন।
সূত্র: দ্য ডিসেন্ট, ৩০ জুলাই ২০২৬
১২ জুলাই — হাইকোর্ট বেঞ্চ (বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ার) রুলসহ আদেশ দেন — স্বরাষ্ট্রসচিব, কোস্টগার্ড ডিজি, আইজিপি, র্যাব ডিজি, বাগেরহাট ডিসি ও এসপিসহ ৯ বিবাদীকে আদেশ পাওয়ার ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে মিরাজ শেখকে আদালতে হাজির করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। সূত্র: প্রথম আলো, ২০ জুলাই ২০২৬
১৯ জুলাই — হিউম্যান রাইটস ওয়াচ প্রতিবেদন প্রকাশ করে এটিকে জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে সম্ভাব্য প্রথম গুমের ঘটনা বলে অভিহিত করে এবং সরকারের গুম-প্রতিরোধী অধ্যাদেশ বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের আহ্বান জানায়। সূত্র: Human Rights Watch, ২০ জুলাই ২০২৬; প্রথম আলো, ২০ জুলাই ২০২৬
২৯ জুলাই — মিরাজ শেখকে গুমের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। ১৬ ও ১৭ মে দুই দিনব্যাপী সরেজমিন তথ্যানুসন্ধান চালিয়ে পড়ে এই দাবি জানায় আসক। এই খবর প্রথম আলোতে প্রকাশের পর ১ আগস্ট পত্রিকাটিতে কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকে একটি প্রতিবাদপত্র পাঠানো হয়। তাদের দাবি, বিষয়টি তদন্তাধীন থাকা সত্ত্বেও অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
কোস্টগার্ডের ভাষ্য অনুযায়ী, মিরাজ শেখ সুন্দরবনের একটি বনদস্যু চক্রের সহযোগী হিসেবে যোগাযোগ রক্ষা, রসদ ও লজিস্টিক সহায়তা, কোস্টগার্ডের গতিবিধি-সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান এবং জেলেদের কাছ থেকে মুক্তিপণের অর্থ সংগ্রহে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক ফৌজদারি মামলা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। একই সঙ্গে বনদস্যু চক্রের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, অর্থ ভাগাভাগি ও সাংগঠনিক বিরোধের কারণে তাঁর নিখোঁজ হওয়ার সম্ভাবনাও তদন্তে বিবেচনায় রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া ২৩ এপ্রিল মোংলা থানায় করা সাধারণ ডায়েরিতে কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা সন্দেহের কথা উল্লেখ ছিল না বলেও দাবি করা হয়েছে।
সূত্র: প্রথম আলো, ২৯ জুলাই ২০২৬ ; প্রথম আলো, ১ আগস্ট ২০২৬
৪ আগস্ট — মিরাজের নিখোঁজ হওয়া প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘একজন ব্যক্তি যে কারণেই নিখোঁজ হন না কেন, তাকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব সরকারের। সরকার নিশ্চয়ই সে দায়িত্ব পালন করবে।’ এর আগে এ প্রসঙ্গে তিনি তদন্তের আগে ঘটনাটিকে সরাসরি ‘গুম’ হিসেবে অভিহিত না করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
বর্তমান: মিরাজ শেখ এখনো নিখোঁজ। ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তাঁকে আদালতে হাজির করতে আদালত বিবাদীদের প্রতি যে নির্দেশ দিয়েছিল, সেই সময় পার হয়ে গেছে।
তথ্যসূত্র
১. প্রথম আলো। (২০২৬, ১৬ মে)। এক মাসের বেশি নিখোঁজ, কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে অভিযোগ স্ত্রীর। https://www.prothomalo.com/bangladesh/district/hvxk2vpt37
২. প্রথম আলো। (২০২৬, ১২ জুন)। মোংলায় কোস্টগার্ড স্টেশনে হামলায় দস্যু-সহযোগীদের সম্পৃক্ততার সন্দেহ। https://www.prothomalo.com/bangladesh/nzji0tami2
৩. প্রথম আলো। (২০২৬, ১২ জুন)। কোস্টগার্ড স্টেশনে হামলা মামলায় নিখোঁজ মিরাজের স্ত্রী, মা-বোনসহ তিন শতাধিক আসামি। https://www.prothomalo.com/bangladesh/district/s2ygbwki7v
৪. Human Rights Watch. (2026, July 19). Bangladesh: First enforced disappearance case since July 2024 uprising. https://www.hrw.org/news/2026/07/20/bangladesh-first-enforced-disappearance-case-since-july-2024-uprising
৫. প্রথম আলো। (২০২৬, ২০ জুলাই)। জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে প্রথম গুমের অভিযোগ তদন্তের আহ্বান এইচআরডব্লিউর। https://www.prothomalo.com/bangladesh/do2o88j7na
৬. The Dissent. (2026, July 30). কোস্টগার্ড আটকের পর ৪ মাস ধরে গুম মিরাজ, প্রতিবাদ করে জেল খেটেছেন মা-স্ত্রী-বোন। https://thedissent.news/bn/current-affairs/four-months-since-coast-guard-detained-miraj-his-family-still-awaits-his-return
৭. প্রথম আলো। (২০২৬, ২৯ জুলাই)। মোংলায় মিরাজ শেখকে গুমের অভিযোগ, নিরপেক্ষ তদন্ত চায় আসক https://www.prothomalo.com/bangladesh/cwqcl67lz7
৮. প্রথম আলো। (২০২৬, ৩১ জুলাই)। মিরাজ শেখকে গুমের অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদনের প্রতিবাদ জানাল কোস্টগার্ড https://www.prothomalo.com/bangladesh/rny8piyuu9
৯. বাংলা ট্রিবিউন। (২০২৬, ৪ আগস্ট). যুবককে ‘গুমের’ অভিযোগ নিয়ে যা বললেন তথ্য উপদেষ্টা https://www.banglatribune.com/national/960841/যুবককে-‘গুমের’-অভিযোগ-নিয়ে-যা-বললেন-তথ্য-উপদেষ্টা
